পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংযুক্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংযুক্তির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দুই শিক্ষক মাসের পর মাস অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া মৌখিক নির্দেশে আরও দুই শিক্ষককে অন্য বিদ্যালয়ে সংযুক্ত রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পর নড়েচড়ে বসে উপজেলা শিক্ষা দপ্তর। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মূল কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ১৩ অক্টোবর দুই শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা নিজ নিজ মূল কর্মস্থলে যোগ দেন বলে জানা গেছে।
গত ৭ অক্টোবর সংযুক্তিতে থাকা শিক্ষকদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন প্রতিবেদক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ অক্টোবর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সোহেল শাহাজাদা স্বাক্ষরিত চিঠিতে তথ্য সরবরাহ করা হয়। দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ছয়জন শিক্ষক সংযুক্তিতে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চারজনের লিখিত আদেশ ছিল। এই চারজনের মধ্যে দুজনের সংযুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও তাঁরা অন্য বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। বাকি দুজনকে মৌখিক নির্দেশে সংযুক্ত রাখা হয়।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গজপুরী পশ্চিমগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রোকসানা আক্তারকে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই পঞ্চগড় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত আদেশে পেড়ালবাড়ী-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। আদেশে সংযুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। মেয়াদ শেষ হলে আদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। পরে গত ১৩ অক্টোবর তিনি মূল কর্মস্থলে যোগ দেন।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে রোকসানা আক্তার বলেন, “মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই সেখানে ছিলাম। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েছিলাম, তবে লিখিত কাগজ পাইনি।”
তাঁর মূল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসনা বেগম বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। তবে তাঁকে অন্য বিদ্যালয়ে রাখার কথা বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। হাসনা বেগমের ভাষ্য, “ডিপিও স্যার বলেন লিখিত লাগবে না, ওইভাবেই থাক। পরে আর চাপ দিইনি। সংযুক্তির বিষয়ে তো আমার কোনো এখতিয়ার নেই।”
একইভাবে টোকরাভাষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সফিউল হককে ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট বেউলাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। তাঁর সংযুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এরপরও তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। পরে গত ১৩ অক্টোবর মূল কর্মস্থলে ফিরে যোগদান করেন।
সফিউল হক বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পাঁচ দিন আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাঁর দাবি, এলাকার লোকজন ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যদের অনুরোধে তাঁকে সেখানে থাকতে বলা হয় এবং পরে লিখিত আদেশ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে তিনি আর লিখিত আদেশ পাননি।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ওই শিক্ষক মূল কর্মস্থলে না ফেরায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, জানতে চাইলে টোকরাভাষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, “বিভিন্ন সভায় মৌখিকভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলাম। এরপর ১৩ অক্টোবর ওই শিক্ষক যোগদান করেছেন।”
অন্যদিকে, চতুরাডাঙ্গী কালিদহপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হারুন অর রশিদকে শিক্ষক সংকটের কারণে শেখবাঁধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌখিক নির্দেশে সংযুক্ত করা হয়। গত ৫ জুলাই সেখানে যোগ দেওয়ার পর ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৩ অক্টোবর মূল কর্মস্থলে যোগ দেন।
হারুন অর রশিদ বলেন, “কর্তৃপক্ষ যেটা বলবে, সেটাই তো আমাদের করতে হবে। আমাকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছিল, আপনি ওই বিদ্যালয়ে যান, পরে চিঠি করে দেওয়া হবে।” লিখিত চিঠি না পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরে ফেরত যেতে বলা হলে তিনি মূল কর্মস্থলে ফিরে আসেন।
সোনাহার মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাবাসসুম তাহমিনাও দেবীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। উপজেলা শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌখিক নির্দেশে তাঁকে সেখানে সংযুক্ত রাখা হয়েছিল। তবে তাঁর সংযুক্তির লিখিত আদেশ নিয়ে নথিতে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
নথি অনুযায়ী, গত ১৯ জানুয়ারি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেনের স্বাক্ষরিত এক আদেশে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশক্রমে তাবাসসুম তাহমিনাসহ নয়জন শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এক সপ্তাহ পর, ২৬ জানুয়ারি ওই আদেশ বাতিল করা হয়। এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত তাবাসসুম দেবীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে তাবাসসুমের মূল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা. নুরুন নাহার বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত চিঠি অনুযায়ী তাবাসসুম ২২ জানুয়ারি থেকে সংযুক্তিতে ছিলেন। ওই আদেশে নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ ছিল না; পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার কথা উল্লেখ ছিল।
তবে ২৬ জানুয়ারি আদেশটি বাতিল হওয়ার পর কোন আদেশের ভিত্তিতে তিনি অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে জানতে তাবাসসুম তাহমিনার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আগের নির্দেশনা থাকলেও নেওয়া হয়নি বিভাগীয় ব্যবস্থা
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজমল হোসেনের স্বাক্ষরিত গত ১০ জুলাইয়ের নির্দেশনায় মেয়াদ শেষ হওয়া শিক্ষকদের নিজ নিজ বিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়। অন্যথায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল। তবে ওই নির্দেশনার পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
গত ৭ অক্টোবর তথ্য চেয়ে আবেদন করার পর শিক্ষকদের গ্রুপে আগের নির্দেশনাটি আবার পাঠানো হয় এবং তাঁদের মূল কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শিক্ষকদের অন্য বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা এবং মৌখিক নির্দেশে সংযুক্ত রাখার বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজমল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনে শিক্ষক সংকট, পারিপার্শ্বিক চাপ ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশের কথা উল্লেখ করেন। তবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনার যা খুশি তাই লেখেন। আমি বক্তব্য দিয়ে এর আগে বিপদে পড়েছি।”
পঞ্চগড় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী মিঞা বলেন, “মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থাকার সুযোগ নেই। আমি মৌখিকভাবে কাউকে সংযুক্তিতে দিতে কিংবা কারও মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থাকার বিষয়ে নির্দেশনা দিইনি। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আজিজুর রহমান বলেন, “এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দেখব।”