আবু সায়েম মোহাম্মদ সা’-আদাত উল করীম
জামালপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জামালপুর শহরে এম এ রশীদ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে মৃতের স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় তথ্য সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপরও হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।
মৃত জেরিনের স্বামী দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, গত ৯ জুলাই স্ত্রীর পেটে সিস্টজনিত সমস্যার কারণে তাকে এম এ রশীদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলে ডা. হারুন অর রশিদের তত্ত্বাবধানে অপারেশন সম্পন্ন হয়।
তার দাবি, অপারেশনের পর প্রথম দিন রোগীর অবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও দ্বিতীয় দিন থেকেই পেট ও পেটের চামড়া অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে থাকে। অবস্থার অবনতি দেখে ঢাকায় নেওয়ার কথা বললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় সাত দিন রোগীকে ছাড়েনি। পরে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দেলোয়ার হোসেনের অভিযোগ, ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানান অস্ত্রোপচারের সময় খাদ্যনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খাবার পেটে ছড়িয়ে মারাত্মক সংক্রমণ হয়েছে। সেখানে পুনরায় অস্ত্রোপচার করা হলেও শেষ পর্যন্ত রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্ত্রীকে দাফনের পর ভুল চিকিৎসার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাইতে গেলে হাসপাতালের স্টাফরা তাকে ও তার স্বজনদের মারধর করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার ও হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এম এ রশীদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিনিধি গণমাধ্যমের কাছে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এক ঘটনার বাইরে আরও বড় প্রশ্ন
এ ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি জামালপুরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবার মান, জবাবদিহিতা ও তদারকি ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
জেলায় গত কয়েক বছরে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্মত সেবা দিলেও বিভিন্ন সময় অতিরিক্ত বিল, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিবন্ধনবিহীন জনবল, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, লাইসেন্স নবায়নে অনিয়ম এবং চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ সামনে এসেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসায় জটিলতা ও চিকিৎসা অবহেলা এক বিষয় নয়। কোনো রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেই তা ভুল চিকিৎসা প্রমাণ করে না। আবার ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলে সেটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্দোষ হলে সেটিও জনসমক্ষে তুলে ধরা জরুরি।
সময়ের দাবি: জেলার সব বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষ অডিট
জনস্বার্থে এখন প্রয়োজন জেলার সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সমন্বিত বিশেষ পরিদর্শন। এ পরিদর্শনে লাইসেন্স ও নবায়ন, চিকিৎসকদের নিবন্ধন, অপারেশন থিয়েটারের মান, আইসিইউ সুবিধা, ল্যাবরেটরির সক্ষমতা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রোগীর নিরাপত্তা, অতিরিক্ত বিল আদায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দালালচক্রের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা উচিত।
একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের সেবার মানও আরও উন্নত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না হন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, সিভিল সার্জন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতি সচেতন মহলের দাবি—ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক। পাশাপাশি জেলার সব হাসপাতালের সেবার মান যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কারণ, স্বাস্থ্যসেবা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন রোগী হাসপাতালের দরজায় জীবন বাঁচানোর আশায় যান—সেখানে নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।