আবু সায়েম মোহাম্মদ সা’-আদাত উল করীম:
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বলিয়াদহ-আগারী সেতুর একটি অংশ ভয়াবহ বন্যায় দেবে যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর আধুনিক হাইড্রোলিক প্রযুক্তির সাহায্যে সেটিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তবে এই সাফল্যের আড়ালেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকল কেন?
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর মধ্যে অস্থায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে হাইড্রোলিক জ্যাক ও পাম্পের মাধ্যমে সেতুর দেবে যাওয়া অংশ ধাপে ধাপে উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, প্রায় ১০ ইঞ্চি নিচে নেমে যাওয়া অংশ ইতোমধ্যে আগের উচ্চতায় তোলা হয়েছে। এরপর স্থায়ী সংযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কারিগরি কাজ চলছে।
তিন উপজেলার মানুষের ভরসার সেতু
ধর্মকুড়া জিসি-মাহমুদপুর জিসি সড়কের ১১০ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার সেতুটি ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও রোগীবাহী যানবাহন এই সেতু ব্যবহার করে।
কিন্তু ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় নদীর তীব্র স্রোতে সেতুর একটি অংশ দেবে যায়। এরপর থেকে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও দীর্ঘ সময় কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
কেন তিন বছর অপেক্ষা?
এলজিইডি সূত্র বলছে, ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, প্রকল্প অনুমোদন, নকশা প্রণয়ন ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সময় লেগেছে। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে “প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস (PSRB)” প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও বিকল্প ব্যবস্থা কিংবা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ না থাকায় বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রিতা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
বিশেষ প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ
প্রকৌশলীরা জানান, প্রচলিত মেরামত পদ্ধতিতে সেতুটি পুনর্বাসন করা সম্ভব ছিল না। তাই হাইড্রোলিক জ্যাক ও পাম্পের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গার্ডার উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ধরনের প্রযুক্তি বাংলাদেশে তুলনামূলক কম ব্যবহৃত হলেও বড় অবকাঠামো পুনর্বাসনে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
২০০৭ সালে প্রায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার ৪১১ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির দুই পাশে প্রায় ১৫০ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক সংস্কারের কাজও চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দেবে যাওয়া অংশ উঁচু করাই যথেষ্ট নয়। কেন সেতুটি দেবে গেল, নদীর তলদেশে স্কাওয়ার (Scour) কতটা হয়েছে, ভবিষ্যতে একই ঝুঁকি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কাঠামোগত স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Structural Health Monitoring) ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকলে একই ধরনের সমস্যা আবারও দেখা দিতে পারে।
দায়বদ্ধতার প্রশ্নও আছে
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ব্যবহৃত হলেও দ্রুত পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থায়নের জটিলতা থাকলেও দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি অবকাঠামো মেরামতের জন্য আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যেত কি না, সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
মানুষের প্রত্যাশা
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু এই সেতুর কাজ শেষ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। জেলার ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য সেতুরও নিয়মিত পরিদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি সেতু ভেঙে পড়া মানে শুধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।