মোঃশাকিল আহমেদ পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি,
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারপাশে হালকা কুয়াশার চাদর, প্রকৃতির নীরবতা ভেঙে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়। আর সেই ভোরেই অনেকের চোখ থাকে উত্তরের দিগন্তে। কখন মেঘের আড়াল সরবে, কখন দৃশ্যমান হবে বরফে মোড়ানো হিমালয়ের অপরূপ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা—এ যেন এক অন্যরকম অপেক্ষা।
দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে মেঘমুক্ত আকাশে দেখা মেলে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার। সূর্যের প্রথম আলো যখন বরফঢাকা পাহাড়ের গায়ে পড়ে, তখন সাদা পাহাড় কখনো সোনালি, কখনো গোলাপি আভায় রূপ নেয়। প্রকৃতির এই অসাধারণ দৃশ্য মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।
কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার গল্প কি কেবল পাহাড় দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
পঞ্চগড়ের মানুষের কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন ঋতু পরিবর্তনের এক বিশেষ বার্তা। শরৎ ও শীতের শুরুর দিকে আকাশ পরিষ্কার হলে স্থানীয়দের অনেকেই দিনের শুরুতে তাকান উত্তরের আকাশের দিকে। কারও কাছে এটি প্রতিদিনের প্রকৃতিদর্শন, কারও কাছে আনন্দের মুহূর্ত, আবার কারও কাছে জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক পরিচিত দৃশ্য।
কাঞ্চনজঙ্ঘাকে কেন্দ্র করে তেঁতুলিয়ার পর্যটন এলাকাতেও তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটক, আলোকচিত্রী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা। কেউ ক্যামেরায় বন্দি করেন পাহাড়ের সৌন্দর্য, কেউ মহানন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন ভোরের আলো, আবার কেউ অপেক্ষা করেন মেঘের পর্দা সরে যাওয়ার।
এই দৃশ্যকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবনেও তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পর্যটকদের আনাগোনায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, চায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কর্মব্যস্ততা বাড়ে। স্থানীয় পণ্য ও খাবারের প্রতিও পর্যটকদের আগ্রহ তৈরি হয়। ফলে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঘিরে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, পঞ্চগড়ের স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি সম্ভাবনাময় দিক রয়েছে।
তবে এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা। পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত শৌচাগার, পার্কিং ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মহানন্দা নদীর তীরসহ দর্শনীয় স্থানগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কাঞ্চনজঙ্ঘা হয়তো পঞ্চগড়ের ভূখণ্ডের অংশ নয়, কিন্তু এই পাহাড়ের দৃশ্য পঞ্চগড়কে দেশের মানুষের কাছে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। দূরের সেই বরফঢাকা শৃঙ্গকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মানুষের আবেগ, পর্যটনের সম্ভাবনা এবং উত্তরের জনপদের এক অনন্য সৌন্দর্যের গল্প।
প্রতিদিন পাহাড় দেখা যায় না। কখনো মেঘ, কখনো কুয়াশা ঢেকে রাখে তার রূপ। তবুও অপেক্ষা থেমে থাকে না। কারণ পঞ্চগড়ের মানুষের কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু দিগন্তের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পাহাড় নয়; এটি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক ভালো লাগার নাম, এক ভোরের অপেক্ষা, এক অনন্য পরিচয়।
দূরের পাহাড়টি হয়তো নীরব, কিন্তু তার সৌন্দর্য প্রতিদিন নতুন করে গল্প বলে পঞ্চগড়ের আকাশে।