আবু সায়েম মোহাম্মদ সা’-আদাত উল করীম,,
শহর কিম্বা গ্রামে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন মানেই সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রায় শুরু হয় নতুন স্বপ্নের সূচনা। কিন্তু জামালপুর সদর উপজেলার একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প সেই স্বপ্নকে পরিণত করেছে হতাশা ও ক্ষোভে। ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৩ কিলোমিটার সড়ক পাকাকরণের ঘোষণা দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধন অনুষ্ঠান করা হলেও পরদিন থেকেই শুরু হয় পুরোনো ইট খুলে নেওয়ার কাজ। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো সড়কের একটি ইটও অবশিষ্ট থাকে না। সব ইট উধাও হয়ে যায়। এরপর আর কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। বর্ষার বৃষ্টিতে কাদায় তলিয়ে যাওয়া সেই সড়ক এখন এলাকাবাসীর চরম দুর্ভোগের অন্যতম কারণ।
অভিনব কায়দায় এই প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামে। গত মে মাসে সংঘটিত ঘটনাটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয় এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার ইটের সড়ক পাকা করার ঘোষণা দিয়ে আয়োজন করা হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন), স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। অনুষ্ঠানে উপস্হিত এলাকাবাসীকে জিলাপী খাইয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এত বড় আয়োজন দেখে কেউই সন্দেহ করেননি যে পুরো বিষয়টি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার অংশ হতে পারে।
উদ্বোধনের পরদিন থেকেই কথিত সাব-ঠিকাদার আবদুল মান্নানের নেতৃত্বে শ্রমিকরা সড়কের পুরোনো ইট খুলে ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে শুরু করেন। কয়েক দিন পার হলেও নতুন করে কোনো নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরে অনুসন্ধান করে তারা জানতে পারেন, প্রকল্পটির কোনো সরকারি অনুমোদন, কার্যাদেশ কিংবা দরপত্রই হয়নি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, ওই সড়কের উন্নয়নকাজের কোনো দরপত্র হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পরই তারা ঘটনার বিষয়ে অবগত হন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণা চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকার পর এলাকায় ফিরে তিনি নিজেকে ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন স্থানে কাজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। একই কৌশলে পরে সদর উপজেলার চাঁদপুর এলাকায় আরেকটি সড়কের ইট খুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। তবে স্থানীয়রা প্রকল্পের কার্যাদেশ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখতে চাইলে তিনি কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এরপর গত ১৬ জুন এলাকাবাসী মান্নানসহ ১১ জনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত রয়েছেন। মামলার তদন্ত চলছে।
সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন) গণমাধ্যমকে বলেন, স্থানীয়দের অনুরোধে তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন। শুরুতে তিনিও প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেননি। পরে আরেকটি সড়কের কাজ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলে এলজিইডি ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, প্রকল্পটির কোনো দরপত্র হয়নি। এরপর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সহযোগিতায় অভিযুক্তদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ময়নার মোড় থেকে ভাঙ্গুরিঘাট পর্যন্ত পুরো সড়কের কোথাও একটি ইটও অবশিষ্ট নেই। বর্ষার পানিতে সড়কটি কাদার সাগরে পরিণত হয়েছে। মোটরসাইকেল, অটোরিকশাসহ কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। অনেককে জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে হাঁটুসমান কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক মাস আগেও যে সড়ক দিয়ে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করা যেত, এখন সেটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার বলেন, প্রতারণার কারণে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়কটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু প্রতারণাকারীদের গ্রেপ্তার করলেই দায় শেষ হবে না। কীভাবে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই উন্নয়নকাজের নামে এমন আয়োজন করা হলো, কেন প্রশাসনের নজরে বিষয়টি আগে আসেনি এবং দায়িত্বে কারও গাফিলতি ছিল কি না—এসব বিষয়ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত সড়কটি পুনর্নির্মাণ করে মানুষের দুর্ভোগ দূর করার জোর দাবি জানান তারা।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একটি সড়কের ইট উধাও হওয়ার ঘটনা নয়; বরং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সংঘটিত একটি ব্যতিক্রমী প্রতারণার নজির। তাদের প্রশ্ন, দিনের আলোয় যদি এভাবে একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে সরকারি উন্নয়নকাজের তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।