মোঃ শাকিল আহমেদ প্রতিনিধি,
পাহাড়ের পাদদেশীয় ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে পঞ্চগড় জেলার কৃষিজমি ক্রমান্বয়ে অম্লীয় বা টক হয়ে পড়ছে। এর ফলে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গাছ তার প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারছে না। এমতাবস্থায় মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে জাদুকরী ভূমিকা রাখছে প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থ ‘ডলোমাইট’ বা ‘ডলোচুন’। কৃষি বিভাগ বলছে, ডলোচুন ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির অম্লতা দূর করে এলাকার প্রধান ফসলগুলোর উৎপাদন ও গুণগত মান সন্তোষজনকভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
ডলোমাইট বা ডলোচুন কী?
ডলোমাইট হলো ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ একটি প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থ। এটি মাটির অতিরিক্ত অম্লতা কমিয়ে উর্বরতা বাড়াতে দারুণ কার্যকরী। কৃষিতে এটি ‘ডলোচুন’ নামেই বেশি পরিচিত।
পঞ্চগড়ের কৃষিতে ডলোচুনের বিশেষ গুরুত্ব:
পঞ্চগড়ের মাটি ও আবহাওয়ায় মূলত চা, ধান, ভুট্টা, আলু, মরিচ, সরিষা এবং বিভিন্ন শাকসবজি ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। তবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ইউরিয়া ও অন্যান্য অম্লীয় সার ব্যবহারের ফলে জমির মাটি অতিরিক্ত এসিডিক হয়ে পড়েছে। মাটি অতিরিক্ত অম্লীয় হলে গাছ মাটি থেকে খাবার গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। এই প্রেক্ষাপটে পঞ্চগড়ের কৃষিজমিতে ডলোচুন প্রয়োগ মাটির পিএইচ (pH) মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে ফিরিয়ে আনে, মাটির স্বাস্থ্য দ্রুত পুনরুদ্ধার করে এবং জমিতে পূর্বে জমে থাকা অব্যবহৃত টিএসপি ও ডিএপি সারের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ডলোমাইট/ডলোচুন ব্যবহারের প্রধান উপকারিতাসমূহ:
ফসলের ফলন বৃদ্ধি: মাটিতে পুষ্টি উপাদানের সঠিক ভারসাম্য বজায় থাকায় গাছের শিকড় সহজে ছড়ায় এবং ধসহ সব ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
গাছকে শক্ত ও রোগপ্রতিরোধী করে: এতে থাকা ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পাতা সবুজ রাখতে এবং সালোকসংশ্লেষণে সরাসরি সাহায্য করে। ফলে গাছ শক্ত ও সতেজ থাকে, রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ কমে এবং গাছ হেলে পড়ে না।
টিএসপি ও ডিএপি সারের সাশ্রয়: ডলোচুন মাটির অম্লতা দূর করায় মাটিতে আগে থেকেই জমে থাকা বা অব্যবহৃত টিএসপি ও ডিএপি সার গাছ সহজেই শোষণ করতে পারে। ফলে আলাদা করে অতিরিক্ত সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
মাটির উর্বরতা ও জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি: এটি মাটির ভেতরে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় এবং মাটির গঠন উন্নত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা রক্ষা করে।
পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি: জমির মাটির গঠন ভালো করায় মাটি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় রস বা আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই: এটি কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে জমির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা বজায় রাখতে দারুণ কাজ করে।
কোন কোন ফসলে বেশি উপকার?
পঞ্চগড়ের প্রধান ফসলগুলোর মধ্যে ধান, ভুট্টা, আলু, চা, শাক-সবজি, মরিচ এবং সরিষা চাষে ডলোচুন ব্যবহারে সুফল পাওয়া যায়। বিশেষ করে রোপা আমন ধান কাটার পরের সময়টি ডলোচুন ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও মাত্রা:
সময় নির্ধারণ: জমি প্রস্তুত করার সময় প্রথম চাষের আগেই ডলোচুন মাটিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। রোপা আমন ধান কাটার পর ডলোচুন ব্যবহারের উত্তম সময়।
প্রয়োগের মাত্রা: পঞ্চগড় অঞ্চলের মাটির প্রকৃতি অনুযায়ী প্রতি শতাংশ জমিতে প্রায় ৫ থেকে ৮ কেজি ডলোচুন ব্যবহার করা যেতে পারে।
পদ্ধতি: সাধারণ সার যেভাবে জমিতে ছিটানো হয়, ঠিক সেভাবে ডলোচুন গুঁড়ো পুরো জমিতে সমানভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। ছিটিয়ে দেওয়ার পর ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি ভালোভাবে উল্টে-পাল্টে মাটির সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। বাতাসের বিপরীতে বা উল্টো দিকে ডলোচুন ছিটানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
বীজ বপনের সময়: জমিতে ডলোচুন প্রয়োগের ১০ থেকে ১৫ দিন পর বীজ বপন বা চারা রোপণ করতে হবে।
কৃষিজমির দীর্ঘস্থায়ী উর্বরতা রক্ষা এবং উৎপাদন খরচ কমাতে পঞ্চগড়ের কৃষকদের জমিতে নিয়মিত ডলোচুন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে স্থানীয় কৃষকদের নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিস অথবা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
— প্রচারে: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বোদা পঞ্চগড়